আর্কাইভ


মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম ((১৬ তম পর্ব)

গোলাম মাওলা রনি : রাজদরবারে ইলিয়াস খানের প্রদত্ত জবানবন্দির বক্তব্য শুনে স্বয়ং সম্রাট রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন। তদ্রূপ উপস্থিত সবাই বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে অপেক্ষা করছিলেন পরবর্তী ঘটনা শোনার জন্য। ইলিয়াস খানও বুঝছিলেন যে, তার নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড হবে। কোনো সম্ভাবনা নেই ক্ষমা পাওয়ার। আর তা তিনি চানও না। দেশ-বিদেশে পালিয়ে থেকে গত কয়েক বছর যে সীমাহীন ঘটনা, দুর্ঘটনা এবং দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, তার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো। তার জীবনের নিরানন্দ এবং শরীরের অঙ্গহানি হয়েছিল আনারকলির জন্য। এই অপমান আর বেদনার কাপুরুষোচিত চিহ্ন বয়ে বেড়ানোর চেয়ে যে কোনোভাবেই হোক না কেন, মৃত্যুই তার কাছে অধিক গ্রহণীয়। আনারকলির কামরায় ঢুকে অধৈর্য হয়ে তার দিকে এগিয়ে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতেই ঘটল অদ্ভুত ও অভাবনীয় একটি ঘটনা। এ কথা বলে ইলিয়াস খান থামলেন এবং সম্রাটের দিকে তাকালেন। সম্রাট হুঙ্কার দিয়ে হুকুম করলেন, পরবর্তী ঘটনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

হে মহামান্য আলমপনা! আমার আক্রমণাত্দক এবং অধৈর্য অবস্থা দেখে আনারকলি হঠাৎ করেই তার অভিব্যক্তি পরিবর্তন করল। বলল ও আচ্ছা! তুমি তাহলে আমার সঙ্গে তাই করতে চাও, যা তোমার মালিক করেছে। বলেই মুচকি হাসি দিয়ে আমার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। আস্তে করে ডান হাতটি বাড়িয়ে দিল। আমি বুঝতে পারলাম না আসলে কি হচ্ছে। বলতে গেলে একদম বোকা হয়ে গেলাম। কারণ আমার চিন্তাশক্তি তখন হারিয়ে গিয়েছিল। সে আমার মুখমণ্ডলে হাত বুলিয়ে আফসোসের সঙ্গে বলল_ এত উত্তেজিত বা অধৈর্য হওয়ার কি আছে? আমার নিঃশ্বাস তখন দ্রুত বইছিল। গলাও শুকিয়ে যাচ্ছিল। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আনারকলি কোনো কথা না বলে আমার চারপাশে দু'তিনবার প্রদক্ষিণ করল। খুশিতে আমার মন ভরে গেল। মনে হলো সে আমাকে ভালোভাবে দেখে নিচ্ছে। ভালো, এটা খুবই ভালো। কারণ গভীর সংস্পর্শে যাওয়ার আগে একজন অপরজনকে দেখে নেওয়া ভালো। রসায়নটা ভালো হয়। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখতে থাকলাম। প্রথম চোখ, মুখ, ঠোঁট, নাক, ভ্রূ, থুঁতনি গলা_ এসব দেখে ধীরে শরীরে নিচের অংশের দিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সে বুঝল এবং মুচকি হাসি দিয়ে পেছনে ফিরল। আমি মনে মনে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম। কারণ আমি তার চুল ও পেছনের সৌন্দর্য দেখার জন্য অধীর হয়ে পড়েছিলাম। আমার মনোভাব বুঝেই সে হয়তো শরীরের পেছনের অংশ আমার দিকে ফিরিয়ে দিল। আমার শরীর বেশ ঢিলেঢালা অবস্থায় টলমল করতে ছিল। আমি তার অপরূপ চুলের স্পর্শ এবং সুগন্ধ পাওয়ার জন্য চোখ বুঝে হাতটা এগিয়ে দিলাম। এমন সময় 'ছ্যারাং পট'- নামের এটি দুর্বোধ্য উজবেক আঞ্চলিক শব্দ বিকটভাবে উচ্চারণ করে আমার দিকে বিদ্যুতের গতি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। মুহূর্তের মধ্যে তার ডান পায়ের হাঁটু দিয়ে আমার মধ্য প্রদেশে আঘাত হানল। আমি শুধু দুটো শব্দ শুনতে পেলাম আনারকলির বিকট চিৎকার 'ছ্যারাং পট' আর আমার অণ্ডকোষের দুটো ডিম ফাটার আওয়াজ। শেষবারের মতো এক পলকে তার রুদ্রমূর্তি দেখে আমি জ্ঞান হারালাম।

প্রায় একদিন পর আমার জ্ঞান ফিরল। আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছাড়াও দিলি্লর নামকরা প্রায় সব চিকিৎসকই উপস্থিত ছিল। আমার স্ত্রীরা, মহলের রক্ষিতা এবং দাসীরা মিলে প্রায় দেড়শ মহিলা সুর করে কাঁদছিল। তাদের কান্না শুনে আমিও শুয়ে শুয়ে কান্না করছিলাম। প্রথমে আমি এমনি এমনি কাঁদছিলাম। কারণ আমার কোনো কিছুই মনে ছিল না। কিন্তু নারীদের কান্নার মধ্যে নানারকম শব্দ ও সুর ব্যবহৃত হচ্ছিল। সেসব শব্দ শুনেই বুঝতে পারলাম আমার অণ্ডকোষ দুটিই ফেটে যায়নি_ আমি চিরতরে পুরুষত্ব হারিয়েছি। আমি খাসি হয়ে গেছি। আমার অতিপ্রিয় এক রক্ষিতা হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বলছিল ও আমার মালিক রে আমার মালিক খাসি হয়ে গেছে রে_ এখন আমার কি হবে রে ইত্যাদি। এবার আমার সবকিছু মনে পড়ল। লজ্জা, ভয়, ঘৃণা এবং অপমানের জ্বালা আমাকে একসঙ্গে পেয়ে বসল। আমি উঠে বসতে চাইলাম। কিন্তু আমি প্রচণ্ড ব্যথার কারণে বসতে পারলাম না। আবার ওই স্থানে হাত নেওয়ারও সাহস পেলাম না। ইঙ্গিতে আমি মহিলাদের কামরা থেকে চলে যেতে বললাম। এরপর চিকিৎসক ও সেবকদের কিছু সময়ের জন্য অন্য কামরায় যেতে বললাম। তারা সবাই চলে যাওয়ার পর আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়লাম। তখন রাতের প্রথম প্রহর। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আমার বিছানার ওপর পড়েছে। বাতাসের ঝাপটায় কামরায় পর্দাগুলো বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে আর চাঁদের আলো ক্ষণে ক্ষণে উজ্জ্বল হতে হতে আবার একটু একটু অাঁধারিতে পরিণত হচ্ছে। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। আমি গুন গুন করে নাকি সুরে মহিলার মতো কান্না শুরু করলাম ও আমার আল্লারে_ আমার এ কী হলো রে, আমি খাসি হয়ে গেলাম রে।

প্রায় ১৫ দিন পর আমি উঠে দাঁড়াতে পারলাম। শরীর-মন সবই ভেঙে পড়েছিল। আমাকে দেখে প্রাসাদের খোঁজা প্রহরী থেকে জেনানা মহলের মহিলারা আড়ালে-আবডালে মুচকি মুচকি হাসত। রাগে-অপমানে সবাইকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তা তো সম্ভব ছিল না। এবার আমি নিজে নিজে আত্দহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। গভীর রাতে আমার প্রিয় চাকুটি নিয়ে আত্দহত্যার উদ্যোগ নিলাম। মরার আগে বেশ কাঁদলাম। চাকুটিকে চুমো খেতে খেতে কেঁদে কেঁদে বললাম, ও হে প্রিয় বনু্ল! সারা জীবন তোমাকে অাঁকড়ে রেখেছি, অন্যের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্য। আজ তোমার সাহায্যে ভবলীলা সাঙ্গ করার প্রতিজ্ঞা করলাম। চোখ বুঝে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে দুই হাতে চাকুর বাঁটে চেপে ধরে নিজের পেটের ওপর তা চালাতে চাইলাম। কিন্তু যত শক্তি নিয়ে শুরু করলাম তা পেটের কাছাকাছি এসে থেমে গেল। কয়েকবার চেষ্টা করলাম কখনো চোখ বুঝে আবার কখনো চোখ খুলে, কিন্তু পারলাম না। বুঝলাম আমি জীবনকে যেরূপ স্বার্থপরের মতো ভালোবাসি, সেই স্বার্থপর মন নিয়ে কখনো আত্দহত্যা করা যায় না। এর সঙ্গে আমার ভীরুতা তো ছিলই। এরপর আমি সাহায্য নিলাম আমার বিশ্বস্ত এক দেহরক্ষীর, যাকে আমার খুবই সাহসী ও নিষ্ঠুর মনে হতো। নাম তার ইন্দু সিংহ।

আমি ইন্দু সিংহের কাছে আমার সমস্যার কথা বললাম। সে প্রথমে রাজি হলো না। বহু অর্থকড়ি দেওয়ার পর সে রাজি হলো। কথা হলো, তলোয়ার দিয়ে এক কোপে আমার শিরশ্ছেদ করবে। ঘটনার সময় সে তার সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর তলোয়ারটি নিয়ে এলো আমার শিরশ্ছেদের জন্য। আমি তার অগি্নমূর্তি এবং তলোয়ারের আকৃতি দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। ডরে আমার পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। দাঁতে দাঁতে কাঁপন ধরে মুখের মধ্যেও ঠক ঠক আওয়াজ শুরু করল। আমার জিহ্বা ও কণ্ঠনালী শুকিয়ে গেল। কোনটা যে দাঁতের শব্দ আর কোনটা যে হাঁটু কাঁপুনির শব্দ, তা আমি বুঝতে পারলাম না। একবার মনে হলো, ইন্দু সিংহকে বলি থাক আমাকে হত্যা করা লাগবে না, আমি বাঁচতে চাই। কিন্তু আমার ভীষণ লজ্জা হলো। মনে করলাম আমাকে যদি ইন্দু কাপুরুষ ভাবে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও সে আমার লজ্জা নামক অনুভূতিটি সচল আছে তা ভেবে আমি মনে মনে তৃপ্তি পেলাম। ফলে কোনো কিছু না বলে আমি চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার সর্বাঙ্গ ঘামছিল আর সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাঁপছিল। মহাবীর ইন্দু সিংহ বিড়বিড় করে তার রাজস্থানী মাতৃভাষায় মন্ত্র জপছিল। এক সময় বিকট চিৎকার করে আমার শিরশ্ছেদের জন্য এগিয়ে এলো বলে মনে হলো। চোখ বুঝে আমি শেষ মুহূর্তের অনুভূতি স্মরণ করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার ঘাড়ে তলোয়ারের আঘাত লাগল না। একটি ধপাস শব্দ হলো আর তারপর হালকা গোঙানির শব্দ। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ খুললাম এবং দেখলাম ইন্দু সিংহ তার বিশাল তলোয়ার এবং দেহ নিয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। ভয়ে সেও সংজ্ঞা হারিয়েছে। নিজের প্রতি খুব রাগ হলো_ আমি যেরূপ মহাবীরের ডাল ধরে শাহজাদা সেলিমকে প্রতারিত করেছি, তদ্রূপ ইন্দু সিংহের মতো কাপুরুষদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছি।

সামগ্রিক পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করল। ফলে আমাকে আত্দহত্যার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে হলো। আনারকলির সঙ্গে আমার অশালীন আচরণ এবং পরবর্তী দুর্ঘটনা আমার প্রাসাদ এবং জমিদারির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুৎবেগে। শুরু হলো কানাঘুষা। আমার অধীনস্থ বিশাল সেনাবাহিনীর বিরাট অংশের নেতৃত্বে ছিল ইরানি, তুর্কি এবং উজবেক সেনাপতিরা। তারা আমার আচরণে ভয়ানক বিরক্ত হলো। ইতোমধ্যে তারা আনারকলিকে তাদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছে। আমি আশঙ্কা করলাম, যে কোনো সময় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। কাজেই মাথা গরম না করে আমি অসুস্থ হওয়ার ভান করে বিছানায় পড়ে থাকলাম। ইতোমধ্যে আমার বিশ্বস্ত লোক মারফত আগ্রায় প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজলের কাছে খবর পাঠালাম। এক লাখ দিনার ইনাম এবং একটি রাজকীয় গ্রেফতারি পরোয়ানা পেলে আমি নিরাপদে আনারকলিকে তুলে দিতে পারব বলে জানালাম। আমার মনষ্কামনা পূর্ণ হলো। রাজকীয় বাহিনীর একটি চৌকস দল স্বর্ণমুদ্রা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে আমার দুর্গে উপস্থিত হলো। আমি আমার বাহিনীর ঊধর্্বতন সেনাপতিদের আমার কামরায় ডেকে পাঠালাম। তারা এলে আমি তাদের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সিলমোহরযুক্ত রাজকীয় গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখিয়ে তাদের মতামত জিজ্ঞাসা করলাম। তারা সবাই উঠে দাঁড়াল এবং প্রধানমন্ত্রীর ফরমানের প্রতি মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করল। কোনো রকম তর্কবিতর্ক না করে তারা রাজকীয় বাহিনীর জিম্মায় আনারকলিকে হস্তান্তর করল। এরপরের ঘটনা আমি কিছুই জানি না। আর আমি নিজে কয়েক মাস পর সুস্থ হলাম বটে, কিন্তু পুরুষত্ব হারিয়ে আমি একটি অপদার্থ মানুষে পরিণত হলাম। সবাই আমাকে নিয়ে কানাঘুষা এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। এরই মধ্যে শুনতে পেলাম আপনি মহামতি সম্রাট আকবরের ক্ষমা লাভ করেছেন এবং জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন। এ খবর শোনামাত্র আমি দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে গেলাম নিরুদ্দেশ হওয়ার জন্য। অনেক বছর পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর পর আপনার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে আজ বিচারের সম্মুখীন হয়েছি। ইলিয়াস খান তার জবানবন্দি শেষ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সর্বোচ্চ নীরবতা নিয়ে সবাই ইলিয়াস খানের জবানবন্দি শুনছিলেন। তার বক্তব্যের পর সম্রাট কাজী উল কুজ্জাতের সঙ্গে কানে কানে কি যেন পরামর্শ করলেন। তারপর বললেন, এই মামলার ঘটনার সঙ্গে আমার আবেগ ও অনুভূতি জড়িত। আসামির প্রতি গত কয়েক বছর ধরে আমি ক্রমান্বয়ে ক্ষুব্ধ হতে হতে ধৈর্যের প্রান্ত সীমায় পেঁৗছে গেছি। আজ ভরা দরবারে তার উদ্ধত এবং খোলামেলা জবানবন্দিতে আমি ভীষণভাবে অপমানিত, লজ্জিত এবং ক্ষুব্ধ হয়েছি। তার সব কথা শুনে আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। কাজেই তার ব্যাপারে রায় প্রদান করা আমার রাজকীয় সম্মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়তো সম্ভব হবে না, কিংবা সমালোচকরা কটূক্তির সুযোগ পাবে। কাজেই ইলিয়াস খানের বিচার আমি সাম্রাজ্যের প্রধান কাজীর দরবারে ন্যস্ত করলাম। সম্রাট এরপর দরবারস্থল ত্যাগ করে তার খাস কামরায় গেলেন। মধ্যাহ্নের ঠিক একটু পর সম্রাট খাস কামরায় ঢুকলেন এবং প্রথমেই জানালেন তিনি দুপুরের খাবার খাবেন না। অস্বাভাবিক ভারি হয়ে আছে মন। এত বেদনায় তার হৃদয় আর কোনো দিন ভারাক্রান্ত হয়নি। বারবার আনারকলির বাস্তব প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছিল মানসপটে। মনে হচ্ছিল, দরবারে বসেই চিৎকার করে কেঁদে জারে জার হওয়ার জন্য। কিন্তু সম্রাটকে যে প্রকাশ্যে কাঁদতে মানা। সেই কান্নার চাপাক্ষোভ এখন তাকে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত করে তুলছে। তিনি বারবার চিন্তা করতে চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল সম্পর্কে। শৈশব ও কৈশোরে তিনি আবুল ফজলের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তিনি কেবল সালতানাতে মোগলের প্রধানমন্ত্রীর ছিলেন না। ছিলেন তার পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আবুল ফজলের বড়ভাই মহাকবি ফৈজিও দরবারের প্রভাবশালী আমাত্য ছিলেন। সম্রাটের নবরত্ন সভার প্রভাবশালী দুই সদস্য ছিলেন এই সহোদর। আবুল ফজলের মতো বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তি সম্রাট জীবনে দেখেননি। অঙ্ক, জ্যামিতি; ভূগোল, ইতিহাস, ধর্মশাস্ত্র, রন্ধন প্রক্রিয়া, সামরিক আইন, মুসলিম আইন এবং কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যায় তিনি কেবল ভারতবর্ষেই শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখেননি, সমসায়মিক তাবৎ দুনিয়ায় তিনি বিখ্যাত ছিলেন তার কর্মের কারণে। রাজদরবারে তার পরিচয় ছিল আবুল ফজল আল্লামী নামে। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের রাজকীয় ইতিহাস আকবরনামা তিনি রচনা করেছেন। মোগলদের বংশ পরিচয়, রাজ্য শাসন, বিচার ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়, বণ্টন, সামরিক বিষয়াদি, যুদ্ধযাত্রা, যুদ্ধ জয়, কূটনৈতিক বিষয়সমূহ_ কী নেই এতে? এত নিখুঁতভাবে সব কিছু বর্ণনা করেছেন যে, প্রতিটি অক্ষরের মধ্যে সম্রাট আকবর যেন জীবন্ত হয়ে আছেন।

আবুল ফজলের পূর্ব পুরুষরা সুদূর ইয়েমেন থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তার বাবা শেখ মুবারক নাগরি ছিলেন বিখ্যাত আধ্যাত্দিক পুরুষ। মূলত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রবর্তিত সুফি মতাবলম্বীর অনুসারী হিসেবে তিনি প্রথম জীবনে আহমেদাবাদে বিভিন্ন সুফি ও দরবেশদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। সমসাময়িক ভারতবর্ষের বিখ্যাত আলেম শেখ আবুল ফজল গজরুনী, শেখ ওমর এবং শেখ ইউসুফের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাগুরু শেখ ইউসুফ তাকে আগ্রায় গিয়ে একটি মাদ্রাসা স্থাপনের আদেশ দেন। আদেশ মতে শেখ মুবারক নাগরি আগ্রায় আসেন ১৫৪৩ সালের এপ্রিলে। যমুনা নদীর তীরে চারবাগ নামক স্থানে তিনি বসতি স্থাপন করেন। সেই বাড়িটিতে যা মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। শেখ মুবারক যেমন তার পাণ্ডিত্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন তেমনি বারবার তার ধর্মীয় মতবাদ পরিবর্তনের জন্য কুখ্যাত হয়ে রয়েছেন। আগ্রার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও তার ধর্মীয় মতবাদ পাল্টে ফেলেছেন। যেমন সুলতান ইব্রাহিম লোদীর আমলে তিনি সুনি্ন মতের অনুসারী ছিলেন। অন্যদিকে শেরশাহ সুরির আমলে মাহদি মতের সমর্থক হয়ে যান। সম্রাট হুমায়ুনের আমলে হজরত খাজা মইনউদ্দিন চিশতি (র.)-এর প্রবর্তিত নকশেবন্দি তরিকা অনুসরণ করতে থাকেন। আর সব শেষে সম্রাট আকবরের আমলে উদারনৈতিক ধর্ম চিন্তার চর্চা আরম্ভ করেন। সন্দেহ করা হয়, তার কারণেই সম্রাট আকবর দীন-ই এলাহী ধর্মমত চালু করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন।

১৫৫১ সালের ১৪ জানুয়ারি আগ্রায় জন্ম হয় আবুল ফজল আল্লামীর। তার বড় ভাই ফৈজিও জন্ম নেন আগ্রায়। শৈশব ও কৈশোরে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্যের খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। স্বয়ং সম্রাট আকবর তার বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করেন আবুল ফজলের দিকে। ফলে ১৫৭৫ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল রাজদরবারে যোগদান করেন সরাসরি মন্ত্রী হিসেবে। আর তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। প্রথম থেকেই যুবরাজ জাহাঙ্গীর প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতেন তাকে। কেবল আনারকলির বিষয়টি নিয়ে তিনি আবুল ফজলের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেন। তার বিশ্বস্ত সেনাপতি বীর সিংহ বুন্দেলার মাধ্যমে ১৬০২ সালের ১২ আগস্ট শাহজাদা সেলিম আবুল ফজলকে খুন করেন। তিনি তখন দাক্ষিণাত্য থেকে রাজধানীতে ফিরছিলেন। মৃত্যুর আগে আবুল ফজল বলেন যান যে, তিনি নির্দোষ। ইলিয়াস খানই আনারকলিকে সম্রাট আকবরের বাহিনীর হাতে তুলে দেন। আজ ইলিয়াস খানের জবানবন্দি শোনার পর শাহেনশাহের হৃদয়ে অশান্তির বহুমুখী ঝড় শুরু হয়। বারবার মনে পড়েছে আনারকলির দুর্ভোগের কথা। একই সঙ্গে মহাজ্ঞানী আবুল ফজলের কথা। তার নির্মম হত্যাকাণ্ড যে একটি মহাভুল ছিল, তা তিনি আজ প্রথমে বুঝতে পারলেন। তার পিতার অকাল মৃত্যুও আবুল ফজলের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কারণ প্রিয় বন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধ সম্রাট কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। ফলে এ ঘটনার পর বলতে গেলে তিনি রাজকার্য ছেড়ে দেন। সারাক্ষণ একাকী বসে বিড় বিড় করে আপন মনে কি যেন বলতেন আর মাথা নিচু করে আপন মনে কাঁদতেন। তার স্মৃতিশক্তিও হ্রাস পাচ্ছিল। এ অবস্থায় ষড়যন্ত্রকারীরা শুরু করে ভয়াবহ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং তা যখন তুঙ্গে পেঁৗছে তখনই সম্রাট ইন্তেকাল করেন। আজ সব ঘটনা ও দুর্ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী করে তীব্র মর্মবেদনা আর অনুশোচনার আগুনে জ্বলছেন সম্রাট নূরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। হঠাৎ তিনি কামরার মধ্যে পায়চারি শুরু করলেন। কি মনে করে সজোরে তালি বাজালেন। তার ব্যক্তিগত সচিব হন্তদন্ত হয়ে হাজির হলেন। সম্রাট হুকুম করলেন, এমন কাউকে জরুরি ভিত্তিতে আমার কাছে আন_ যে কিনা নির্ভয়ে আমাকে ধর্মের কথা শোনাবে এবং আমার কুকর্মগুলোতে নির্দ্বিধায় আমার সামনে প্রকাশ করে দেবে। তার কথার তীব্র আঘাতে আমি ক্ষতবিক্ষত হয়ে চিৎকার করে কাঁদতে চাই।

রাজদরবারের প্রধান সচিব মির্জা সরফরাজ খানের একান্ত বিশ্বস্ত এবং সম্পর্কে মামাত ভাই মির্জা এজাজ দীর্ঘদিন ধরে সম্রাটের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করছেন। সম্রাটের অনেক কিছুই তার নখদর্পণে। কিন্তু এমন অদ্ভুত বিষয়ের হুকুম পাবেন, তা ছিল কল্পনারও বাইরে। ফলে মির্জা এজাজ প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তারপর একটু সামলে নিয়ে সম্রাটকে বললেন, আলমপনা আমি এমন একজন সাধু পুরুষকে জানি, যিনি কখনো কোনো রাজদরবারে যান না। আমার সঙ্গে রয়েছে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তিনি যদি আপনার সামনে আসেনও তবে ঘটনা ঘটবে উল্টো। তিনি আপনাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলবেন এবং সম্রাট হিসেবে কোনো সম্মানই প্রদর্শন করবেন না। আর আপনি যেমন চাচ্ছেন তা তিনি করতে পারবেন নির্দ্বিধায়। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, যদি না আপনি আরও বেশি দুঃখ পেয়ে বসেন নিজের অন্তর্নিহিত দুঃখকে তাড়াতে গিয়ে। সম্রাট হাত নেড়ে নিজের সম্মতি জানিয়ে বললেন, তাকে আনার ব্যবস্থা কর_ অত্যন্ত সম্মান সহকারে এবং আমার এই খাস কামরায়।

মির্জা এজাজ যার কথা বলেছিলেন তিনি হলেন হজরত আবদুর রহমান (রহ.), হজরত মোজাদ্দেদ আল-ফেসানির (রহ.) অন্যতম শিষ্য। অসম্ভব রাগী বিদ্বান এবং এলমে মারেফতের উঁচু স্তরের দরবেশ। মোগল দরবারের নানাবিধ অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচকদের অন্যতম ব্যক্তি হলেন হজরত আবদুর রহমান (রহ.)। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তিনি সম্রাট ও রাজপুরুষদের সমালোচনা করেন। পাণ্ডিত্য, নির্লোভ এবং নির্মোহ সাদাসিধা জীবন প্রণালী এবং আধ্যাত্দিকতার জন্য আগ্রায় সবার কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তার ইবাদতখানায় দৈনিক হাজার হাজার লোকের সমাবেশ হতো। রাজদরবারের অনেকে যেতেন, যারা তুলনামূলকভাবে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ। মির্জা এজাজ এদেরই একজন। খবর পেয়ে হজরত আবদুর রহমান (রহ.) সম্রাটের খাস কামরায় ঢুকলেন এবং বললেন হে আকবরের পুত্র সেলিম আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। সম্রাট সালামের জবাব দিয়ে তাকে বসতে বলবেন। হজরত আবদুর রহমান (রহ.) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি আমায় কেন ডেকেছেন। সম্রাট বললেন_ আপনি কখনো রাজদরবারে আসেন না কেন! তিনি উত্তর করলেন, রাজদরবারে আমার তো কোনো কাজ নেই। এখন বলুন, কেন ডেকেছেন। কিছু ভালো কথা শুনতে চাই, সম্রাট বললেন। তিনি বললেন, আমার জ্ঞান অত্যন্ত পরিশ্রমলব্ধ এবং আমি তা কখনো উপযাচক হয়ে বিতরণ করি না। আপনি তো নয়ই, আমার আশঙ্কা হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনবেন কিন্তু ভুলে যাবেন পরমুহূর্তে। আর অনুসরণ তো করবেনই না। এ অবস্থায় সম্রাটের দেহরক্ষী ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে তরবারির কব্জায় হাত রাখল এবং তা বের করার মহড়া দিতে খটখট আওয়াজ করল। সম্রাট তাকে ধমক দিয়ে শাসালেন এবং বললেন এটা সওয়াবের মজলিশ। শাস্তির স্থান নয়। নিজেকে সংযত কর নতুবা এখান থেকে বেরিয়ে যাও। সম্রাটের এ ধরনের ব্যবহার দেখে হজরত আবদুর রহমানের হৃদয় খুশি হয়ে গেল। তিনি বলতে আরম্ভ করলেন_ হে ভারত বর্ষের শাসক! আপনি কি পবিত্র কোরআনের সেই আয়াতটি পড়েছেন। যেখানে আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় নবী যিনি কিনা খুব বড় বাদশাহও ছিলেন, তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন_ 'হে দাউদ আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা করেছি। অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার কর এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর না। তাহলে খেয়াল-খুশি তোমাকে আল্লার পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।' যাবুর কিতাবে আল্লাহ বলেন, 'যখন বাদী-বিবাদী উভয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হবে, তখন তুমি প্রথমে তাদের দিকে তাকাও। তারপরও নিজের অন্তরকে জিজ্ঞাসা কর যে, তুমি কারও প্রতি পক্ষপাত করবে কিনা বা কারও প্রতি তোমার ঝোঁক রয়েছে কিনা? তোমার মন যদি বাদী বা বিবাদী কারও জয় বা পরাজয়ের ব্যাপারে সামান্যতম ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে তুমি ন্যায় বিচারক হতে পারবে না এবং আমি তোমার নাম নবুয়তের খাতা থেকে কেটে দেব। হে দাউদ! আমি আমার রাসূলগণকে উটের রাখালদের মতো করেছি। রাখালরা পথঘাট সম্পর্কে অবগত থাকে। তারা নরমভাবে শাসন করে। মোটা উটকে বেঁধে রাখে এবং দুর্বল ও কৃশ উটের সামনে ঘাস-পানি দেয়।

হে শাহেনশাহ! আপনি কি জানেন, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) কি বলেন? তিনি বলেন, বুদ্ধিদীপ্ত সৎকর্মী ব্যক্তিই শাসনকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। শাসকের কোনো মন্দ দোষ যেন লোকের কাছে প্রকাশ হয়ে না পড়ে। অন্যদিকে শাসক কোনো অবস্থাতেই আত্দীয় তোষণ করবে না। যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে বসাবে। আর ধর্মীয় ব্যাপারে কঠোর অবস্থান থেকে মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার স্থানটিকে নিরাপদে হেফাজত করতে হবে। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শাসক যেন কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করে। তিনি আরও বলেন : শাসক চার ধরনের_

১) যে নিজেও পরিশ্রম করে এবং কর্মচারীদের কাছে থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পরিশ্রম আদায় করে নেয়। এ ধরনের শাসক আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের মতো সম্মানিত এবং সৌভাগ্যবান। তার এবং তার কর্মের ওপর আল্লাহর রহমতের হাত প্রসারিত থাকে।

২) যে শাসক কিছুটা দুর্বল। নিজে পরিশ্রম করে কিন্তু তার কর্মচারীরা সব আলস্যের জয়গান করে এবং বিত্ত-বিলাসে মত্ত হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা রহমত না করলে সে ধ্বংসের মুখোমুখি হয় প্রতিনিয়ত।

৩) যে কর্মচারীর কাছ থেকে পরিশ্রম নেয় কিন্তু নিজে অলসতা করে এরূপ শাসক একাই ধ্বংস হয়ে যায়।

৪) যে নিজেও অলসতা করে এবং কর্মচারীরা তা-ই করে। এখানে সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আপনি কি হজরত ইবনে মুহাজির বর্ণিত আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের সেই বিখ্যাত ঘটনাটি শুনেছেন? খলিফা মনসুর মক্কায় এসে তার সরকারি বাসভবনে থাকতেন এবং প্রতিদিন ভোর রাতে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করতে বের হতেন। তিনি নীরবে এবং গোপনে তাওয়াফ শেষে এমনভাবে নামাজ আদায় করতেন যে, উপস্থিত লোকজন তা টেরই পেত না। এমনি একরাতে তিনি দেখলেন জনৈক ব্যক্তি সুলতানাতের কাছে দাঁড়িয়ে অনুচ্চস্বরে মোনাজাত করছে এবং বলছে, 'ইয়া ইলাহি, আমি তোমার দরবারে ফরিয়াদ করছি_ আমাদের রাজ্যে নাফরমানি ও ফ্যাসাদ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জুলুম ও লালসার কারণে হকদাররা তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছে না। খলিফা মনসুর কানখাড়া করে লোকটির বক্তব্য শুনলেন এবং নিরাপদ দূরত্ব গিয়ে প্রহরীদের মাধ্যমে লোকটিকে ডাকালেন। লোকটি আসার পর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে প্রিয় বন্ধু, আপনার মোনাজাতের অর্থ কি? আমি তো আপনার কথা শুনে অসুস্থ হয়ে পড়ছি এবং অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। লোকটি তার কাছে নির্ভয়ে সবকিছু বলার এজাজত চাইলেন। খলিফার অভয় পেয়ে তিনি বললেন সত্য বলতে কি! এ রাজ্যে হক ও হকদারের মধ্যে যার লালসার কারণে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যক্তি স্বয়ং আপনি! মনসুর বললেন, ও রে হতভাগা! আমার মধ্যে এত লালসা কেন আসবে? অর্থ-সম্পদ, সোনাদানা এবং ক্ষমতা_ সবই তো আমার করতলগত। লোকটি উত্তর করলেন, আমিরুল মুমেনিন! যে পরিমাণ লালসা আপনার মধ্যে প্রবেশ করেছে, তা আপনার রাজ্যে অন্য কারও মধ্যে প্রবেশ করেনি। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ আপনাকে জনগণের শাসক করেছেন এই উদ্দেশ্যে যে_ আপনি তাদের ধনসম্পদ ও কাজ-কারবার হেফাজত করবেন, কিন্তু আপনি তা না করে তাদের সম্পত্তি কুক্ষিগত করার চেষ্টায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। নিজের মধ্যে ও তাদের মধ্যে ইট, চুনার প্রাচীর, লৌহ দরজা এবং সশস্ত্র দারোয়ান খাড়া করেছেন। আপনি নিজেকে প্রাসাদের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ আপনার কাছে যেতে না পারে।

হে আমিরুল মুমেনিন, আপনার নিযুক্ত সরকারি কর্মচারীরা সারা দেশে জুলুম ও নির্যাতনের জাল পেতে জনগণের শ্রম ও রক্তের হিস্যা জোর করে ছিনিয়ে আনছে এবং আপনার উজির-নাজিরসহ আপনার পরিবারের জীবনযাত্রা ঝলমলে করে তুলছে। আপনি ভুলে গেলে তারা স্মরণ করিয়ে দেয় না এবং আপনি ভালো কাজ করতে চাইলে তারা সহযোগিতা করে না। আপনি যে সব কর্মচারীকে খাস মোসাহেব নিযুক্ত করেছেন এবং সাধারণ প্রজাকুলের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন_ তারা যখন দেখল, রাজকোষ থেকে আপনি ইচ্ছামতো ভোগ-বিলাসের জন্য অর্থ নিয়ে যান। তখন তারা মনে মনে বলল, খলিফা আল্লাহর হক খেয়ানত করে, তাহলে আমরা করব না কেন। আমিরুল মুমেনিন! আমি এক সময় দেশ সফর করতাম। সেখানকার এক রাজা হঠাৎ বধির হয়ে গেল। তিনি দিনরাত কান্নাকাটি করতেন আর বলতেন_ আমি যে বধির হয়ে গেছি, এতে আমার নিজের যে বিপদ হয়েছে তার জন্য দুঃখ করি না। আমার দুঃখ এ জন্য যে, মজলুমরা আমার দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করবে। কিন্তু আমি তাদের আওয়াজ শুনতে পাব না। এরপর রাজা দৃঢ় প্রত্যয় সহকারে বললেন : আমি শ্রবণশক্তি হারিয়েছি তাতে কি হয়েছে? আমার চক্ষু তো বিদ্যমান আছে। তিনি রাজ্যময় ঘোষণা দিলেন_ কেউ লাল পোশাক পরিধান করতে পারবে না। একমাত্র মজলুম ব্যক্তিই লাল পোশাক পরবে এবং আমি তাকে চিনে নেব। এরপর রাজা সকাল-বিকাল ঘোড়ায় করে চলাফেরা করতেন এবং রাজ্যে ইনসাফ কায়েম করতেন। এসব উপদেশ শুনে শাহেনশাহ জাহাঙ্গীর কান্না শুরু করলেন এবং বললেন_ হে শায়খ আবদুর রহমান! আপনি মহান খলিফা মনসুরের উপমা টেনে যা যা বললেন, তার সব কিছুই আমার রাজ্যে বিদ্যমান। যে রাজত্ব নামক অগি্নকুণ্ডটি লাভ করছি, তা কিভাবে চালাব, সবাই তো বিশ্বাসঘাতক। আবদুর রহমান বললেন, আপনি উঁচুস্তরের মুরশিদ ও ইমামদের সঙ্গে সময় পেলে নিয়মিত আলোচনায় বসুন। এতে আপনার মনে স্থিরতা আসবে এবং বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। সম্রাট বললেন, কিন্তু তারা তো আমার কাছ থেকে দূরে সরে থাকে। আবদুর রহমান বললেন, তাদের সরে থাকার কারণ হচ্ছে_ তারা আশঙ্কা করে যে, আপনি হয়তো খেয়ালের বশে তাদের দিয়ে সেই কাজ না করান, যে কাজ কর্মচারীদের দিয়ে করিয়ে থাকেন। বরং আপনি দরজা উন্মুক্ত করুন, দারোয়ান হ্রাস করুন, মজলুমের শোধ জালেমের কাছ থেকে নিন, জালেমকে জুলুম থেকে বিরত রাখুন। হালাল ও পবিত্র উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করুন এবং ন্যায় ও ইনসাফ সহকারে সরকারি অর্থ বণ্টন করুন। আপনি যদি এরূপ কাজ করতে পারেন, তবে আমি আপনাকে এ নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, যারা এখন আপনার কাছ থেকে দূরে সরে থাকে, তারা আপনার কাছে আসবে এবং প্রজা সাধারণের কল্যাণ সাধনে আপনাকে সাহায্য করবে।

বক্তব্য শেষ করে আবদুর রহমান চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। সব রীতি ভেঙে শাহেনশাহও উঠে দাঁড়ালেন। এরপর মুসলমান রীতিতে কোলাকুলি করে তাকে ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর সম্রাট বললেন, ইয়া ইলাহি! এই লোকের উপদেশমতো আমাকে কাজ করার তৌফিক দান কর।

শায়খ আবদুর রহমান চলে যাওয়ার পর সম্রাটের মন অসম্ভব ভালো হয়ে গেল। তিনি কামরা থেকে বেরিয়ে প্রাসাদের পশ্চিম বেদিতে গেলেন। সূর্য অস্ত যাওয়ার তখনো কিছু সময় বাকি আছে। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা পশ্চিম দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্রাট বেশ মনোযোগ সহকারে আকাশের সেই লাল রং দেখতে লাগলেন। তার মনে পড়ল শৈশবের কথা। কে যেন তাকে শিখিয়েছিল যে, আকাশের ওই লাল রং হলো ইমাম হাসান-হোসেনের রক্ত। শৈশব থেকে যে লাল রং এবং উপকথা শুনে আসছেন, তা আজকের এই পরিণত বয়সেও তিনি হেসে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। বরং ইমাম হাসান-হোসেন এবং ইসলামের জন্য এক গভীর মমত্ব অনুভব করলেন। এমন সময় মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি এলো। মাগরিবের আজান। সম্রাট অনেক দিন পর জামাতে নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদের দিকে পা বাড়ালেন।

অন্যান্য রাতের তুলনায় সম্রাট আজ একটু আগেই নৈশভোজ সারলেন। সরকারি কোনো কাজ করবেন না বলে ব্যক্তিগত সচিবের মাধ্যমে দরবারের প্রধান সচিব মির্জা সরফরাজ খানকে জানিয়ে দিলেন। কারণ একটাই_ নূরমহলের কাছে যেতে হবে। আজ তাদের বিবাহিত জীবনের তৃতীয় বাসর। অনেক কিছু তার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। বিশেষ করে চুদুরবুদুর পাগলরূপী পারস্য সেনাপতি মালিক ইবনে ইয়াসারের প্রসঙ্গটি। কিন্তু তা সবার আগে নিজেকে নুর মহলের জন্য আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে। সারা দিনের কর্মব্যস্ততার কারণে শরীর ছিল বেশ ক্লান্ত। ঘামের গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকেও হালকা গন্ধ বের হচ্ছিল। মুখমণ্ডলে হাত বুলিয়ে দেখলেন এবং বুঝলেন ক্ষৌরকর্ম দরকার। সম্রাট হাম্মামে ঢোকার আগে ভালোভাবে ক্ষৌরকর্ম সারলেন এবং শরীরের সব অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করলেন। হাতের নখ পরিচর্যার পাশাপাশি পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে কোনো অস্বস্তিকর দুর্গন্ধ আছে কিনা তা পরখ করলেন। এরপর দাঁত, জিহ্বা এবং কণ্ঠনালী যথাসম্ভব পরিষ্কার করে হাম্মামে ঢুকলেন।

হাম্মাম সেরে তার খাস কামরায় প্রবেশ করা মাত্র তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন, নুরমহল তার জন্য নিজ হাতে সেলাই করে আজ রাতে পরার জন্য চমৎকার একটি পোশাক পাঠিয়েছেন। সম্রাট মনে মনে শুকরিয়া আদায় করে পোশাকটি পরলেন। অসম্ভব সুন্দর লাগছে নিজেকে আর মনের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে কথাটিই মনে হলো তার। এবার তিনি পদ্মমধু ও মৃগনাভির সমন্বয়ে তৈরি এক পেয়ালা শরবত পান করলেন। শরীর ও মনকে উত্তেজিত করার জন্য শাহী হেকিমের তৈরি ওষুধও সেবন করলেন। তারপর ঠিক সম্রাটের বেশে নুরমহলের খাস কামরার দিকে এগুলেন। সম্রাটের আগমন বার্তায় রাজ অন্তপুরের সানাই ও নহবতের শিল্পীরা ছন্দে ছন্দে সুর তুললেন। সম্রাট নুরমহলের কামরায় ঢুকে প্রথমেই নজর দিলেন প্রিয়তমা পত্নীর মুখমণ্ডলের ওপর। তারপর নজর গেল অন্য একটি জিনিসের ওপর। তিনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন সেটির ওপর এবং কয়েকবার উচ্চারণ করলেন_ সুবহানাল্লাহ! মারহাবা! ইয়া মারহাবা! (চলবে)

পূর্বের পর্ব এক সাথে পড়তে...

http://dnewsbd.com/single.php?id=35382
মোঘল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম (১৫ তম পর্ব)
http://dnewsbd.com/single.php?id=35514















সতর্কীকরণ: এই অনলাইন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
comments powered by Disqus

Rank